রবিবার, ১০ মে ২০২৬, ০৪:৪৬ অপরাহ্ন
ভয়েস ডেস্ক:
দেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় যখন লাগামহীন, তখন রান্নার গ্যাসের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি মরার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম সরকারি হিসেবেই বেড়েছে প্রায় ৪৩ শতাংশ। গত ফেব্রুয়ারিতে যে সিলিন্ডারের দাম ছিল ১ হাজার ৩৫৬ টাকা, বর্তমানে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) তা নির্ধারণ করেছে ১ হাজার ৯৪০ টাকা। তবে বাজারের বাস্তব চিত্র আরো ভয়াবহ।
বিইআরসি প্রতি মাসে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে দর ঘোষণা করলেও সাধারণ ভোক্তাদের বাজারে গিয়ে গুনতে হচ্ছে বাড়তি ২০০ থেকে ৩০০ টাকা। ফলে ১ হাজার ৯৪০ টাকার সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে ২ হাজার ২০০ টাকারও বেশি দামে। কিছু অসাধু ও অতি মুনাফালোভী ব্যবসায়ীরা সরকার নির্ধারিত দাম তোয়াক্কা না করে বাড়তি দাম রাখায় এখন সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে।
রবিবার (১০ মে) রাজধানীর রায়েরবাজার, নিউমার্কেট ও কারওয়ানবাজারসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে ঘুরে ক্রেতা-বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সরকার নির্ধারিত দামে বাজারে মিলছে না এলপিজি সিলিন্ডার গ্যাস। এছাড়াও এখনো বাজারে এলপিজি’র সংকট কিছুটা রয়েছে।
রাজধানীর রায়েরবাজারে নিজের বাসার জন্য ১২ কেজির সিলিন্ডারের গ্যাস নিতে এসেছেন গৃহিণী তাহমিনা তন্নী। তিনি রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, “গত ফেব্রুয়ারিতেও ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকায় গ্যাস কিনতাম, এখন দোকানে গেলেই ২ হাজার ২০০ টাকা চায়। অথচ শুনি সরকারি দাম নাকি ১ হাজার ৯৪০ টাকা। আমাদের মতো মধ্যবিত্তদের জন্য তিন মাসে গ্যাসের দাম এভাবে ৪৩ শতাংশ বেড়ে যাওয়া মানে হলো- সংসার চালানো অসম্ভব হয়ে পড়া। রান্নার খরচ জোগাতে গিয়ে এখন খাবারের তালিকা ছোট করতে হচ্ছে।”
রাজধানীর নিউমার্কেটে এলপিজি সিলিন্ডার নিতে এসেছেন বেসরকারি চাকরিজীবী প্রিতম হাসান। তিনি বলেন, “গত তিন মাসে তো আমার বেতন এক টাকাও বাড়েনি, কিন্তু গ্যাসের পেছনেই মাসে বাড়তি ৭০০-৮০০ টাকা চলে যাচ্ছে। বিইআরসি প্রতি মাসে কিসের দাম নির্ধারণ করে তা আমরা বুঝি না, কারণ বাজারে কখনোই সেই দামে গ্যাস পাওয়া যায় না। ডিলার আর খুচরা বিক্রেতারা সিন্ডিকেট করে আমাদের পকেট কাটছে, দেখার কেউ নেই। এখন রান্না করে খাওয়া জন্য অন্য জায়গায় থেকে খরচ কাটছাঁট করতে হচ্ছে।”
কারওয়ানবাজারে এলপিজি সিলিন্ডার কিনতে এসেছেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রিফাত হোসেন। তিনি বলেন, “আমরা ছাত্র মানুষ, মেসে থাকি। আগে গ্যাসের বিল ভাগ করে দিলে গায়ে লাগত না। কিন্তু এখন হঠাৎ করে দাম এত বেড়ে যাওয়ায় আমাদের মাসিক বাজেটে টান পড়েছে। দোকানদাররা বলে সরবরাহ কম, তাই দাম বেশি। সরকারি তদারকি না থাকলে আমাদের মতো সাধারণ মানুষের টিকে থাকা কঠিন।”
একই বাজারের এলপিজি সিলিন্ডারের খুচরা বিক্রেতা মো. সজিব মোল্লা রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, “মানুষ আমাদের কথা শোনায়, কিন্তু আমাদের কিছু করার নেই। কোম্পানি থেকে আমাদের যে দামে কিনতে হয়, তার সঙ্গে পরিবহন খরচ যোগ করলে বিইআরসির নির্ধারিত দামে বিক্রি করা সম্ভব না। আমরাই বেশি দামে কিনছি, তাই ১ হাজার ৯৪০ টাকায় গ্যাস বিক্রি করলে আমাদের লোকসান দিতে হবে। এর জন্য দায়ী হলো জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি।”
নিউমার্কেটের এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রেতা শাহারিয়ার আহমেদ। তিনি বলেন, “আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার অজুহাতে কোম্পানিগুলো সরবরাহ কমিয়ে দেয়। চাহিদার তুলনায় সাপ্লাই কম থাকলে পাইকারি বাজারেই দাম বেড়ে যায়। আমরা কোম্পানি থেকে সরাসরি সরকার নির্ধারিত রেটে সিলিন্ডার পাই না। ডিলার পর্যায়েই যদি দাম বেশি থাকে, তবে খুচরা বাজারে এর প্রভাব পড়াটা স্বাভাবিক।”
সর্বশেষ গত ১৯ এপ্রিল বিইআরসি এলপিজির মূল্য সমন্বয় করে। এতে প্রতি কেজিতে ১৭ টাকা ৬২ পয়সা দাম বৃদ্ধি করা হয়। সে হিসাবে ৫ দশমিক ৫ কেজির সিলিন্ডারের দাম ৮৮৯ টাকা, ১২ দশমিক ৫ কেজির ২ হাজার ২১ টাকা, ১৫ কেজির ২ হাজার ৪২৬ টাকা, ১৬ কেজির ২ হাজার ৫৮৭ টাকা, ১৮ কেজির ২ হাজার ৯১১ টাকা, ২০ কেজির ৩ হাজার ২৩৪ টাকা, ২২ কেজির ৩ হাজার ৫৫৮ টাকা, ২৫ কেজির ৪ হাজার ৪৩ টাকা, ৩০ কেজির ৪ হাজার ৮৫১ টাকা, ৩৩ কেজির ৫ হাজার ৩৩৬ টাকা, ৩৫ কেজির ৫ হাজার ৬৬০ টাকা এবং ৪৫ কেজির ৭ হাজার ২৭৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সাবেক অধ্যাপক, জ্বালানি ও টেকসই উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন জানান, সরকার শুধু কাগজে-কলমে দাম নির্ধারণ করে দিলে হবে না, বরং মাঠ পর্যায়ে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। কেন সরকারি দরের চেয়ে ৩০০ টাকা বেশি দামে ভোক্তাকে গ্যাস কিনতে হচ্ছে, তার জবাবদিহিতা কোম্পানি ও ডিলার উভয় পক্ষকেই দিতে হবে। এছাড়া, ডলার সংকটের কারণে আমদানিতে কোনো জটিলতা হচ্ছে কি না, তাও খতিয়ে দেখা দরকার। যদি দ্রুত এই সিন্ডিকেট ভাঙা না যায়, তবে সাধারণ মানুষের জ্বালানি নিরাপত্তা চরম ঝুঁকির মুখে পড়বে।
ভয়েস/জেইউ।